প্রথমবারের মতো চীনের পণ্য বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলার পেরিয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা থাকলেও রফতানি বাড়ায় উদ্বৃত্ত রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রথম ১১ মাসে চীনের পণ্য বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে। গত বছর উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৯৯ হাজার ২০০ কোটি ডলার। তবে আমদানি ও রফতানির ব্যবধান কমার বদলে আরো বেড়েছে বলে গতকাল প্রকাশিত চীনের কাস্টমস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যে জানানো হয়েছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও এপি।
চীনে নভেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অক্টোবরে রফতানি অপ্রত্যাশিতভাবে কমে গিয়েছিল। তার পরের মাসে এ বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে। একই সময় আমদানি বেড়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। নভেম্বরে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে অক্টোবরে সম্মত এক বছরের বাণিজ্য বিরতি এ প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাড়ায় আন্তর্জাতিকভাবে চাপও বাড়ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সাম্প্রতিক চীন সফরে রফতানি ও আমদানির বড় ধরনের বৈষম্য নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভবিষ্যতে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়াতে পারে।’
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রমুখী চীনা রফতানি আগের বছরের তুলনায় নভেম্বরেও প্রায় ২৯ শতাংশ কমেছে। ধারাবাহিকভাবে আট মাস যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি দ্বিগুণ অংকে সংকুচিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চীনা পণ্যের জন্য অন্যতম প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক ইউবিপির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ কার্লোস কাসানো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনো তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য ঢোকার বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে না। এ সুযোগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের রফতানি বাড়ছে। সেখান থেকে চীনা পণ্য পরোক্ষভাবে মার্কিন বাজারেও পৌঁছাচ্ছে।’
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনের রফতানি নভেম্বরে আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অক্টোবরে এ প্রবৃদ্ধি ছিল দশমিক ৯ শতাংশ। ইউয়ানের দরপতনের কারণে ইউরোপীয় বাজারে চীনা পণ্যের প্রতিযোগিতা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন আইএনজির চিফ চায়না ইকোনমিস্ট লিন সং। তিনি বলেন, ‘রফতানির এ গতি আগামী বছরও কিছুটা ধরে রাখতে পারে। তবে শুল্ক ঝুঁকি ও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে আসায় বাণিজ্য পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকছে।’
এসব ইতিবাচক প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। দেশটিতে রিয়েল এস্টেট খাতের প্রবৃদ্ধি পাঁচ বছর ধরে নিম্নমুখী। দুর্বল ভোক্তা চাহিদা ও বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটাতে বেইজিং রফতানিতে গুরুত্ব বাড়িয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সাম্প্রতিক বৈঠকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে নতুন করে গুরুত্ব দেয়ার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি, ব্যাটারি ও রোবোটিকসের মতো উচ্চ প্রযুক্তি খাতকে নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
চীনের কারখানা কার্যক্রম নভেম্বরে টানা আট মাস সংকুচিত হয়েছে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য বিরতির পর চাহিদার পুনরুদ্ধার কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তার পরও রফতানির শক্ত ভিত্তির কারণে চলতি বছর চীন প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।
চীন চলতি বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও ইউরোপে রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। দেশের মোট রফতানির মধ্যে এসব অঞ্চলের অংশ ক্রমেই বড় হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক সত্ত্বেও চীন নতুন বাজারে প্রবেশ করছে এবং বাণিজ্য পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়াকে কাজে লাগাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক মরগ্যান স্ট্যানলি মনে করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট পণ্য রফতানিতে চীনের হিস্যা ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছতে পারে। ইভি, ব্যাটারি ও রোবোটিকস খাতে শক্ত অবস্থান এখনো চীনের রফতানি ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি থাকলেও তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর কারণে চীনের রফতানি বাড়ছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছর চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আরো বড় হতে পারে।
রেকর্ড উদ্বৃত্ত চীনের অর্থনীতিতে স্বস্তি আনলেও বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জটিল হতে পারে। শুল্ক, ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির অনিশ্চয়তা চীনের বাণিজ্য সম্ভাবনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।